মতামত: ১০ই এপ্রিল, ২০২৬: একটি গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের কাজ শুধুমাত্র নীতি প্রণয়ন নয়, বরং সেই নীতির সঠিক তথ্য নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন তথ্য প্রচার ক্রমশ বড় আকারের বিজ্ঞাপন প্রচারণায় পরিণত হয়, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, তথ্য প্রদান আর রাজনৈতিক প্রচারের সীমারেখা কোথায়?
এই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে Newslaundry-এর একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৪–১৫ থেকে ২০২৪–২৫ সময়কালে প্রায় ₹৫,৯৮৭.৪৬ কোটি বিজ্ঞাপনে ব্যয় করেছে; যা দৈনিক গড়ে প্রায় ₹১.৫ কোটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪–১৫ সালে বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় ছিল ₹৭৬৫.৮৩ কোটি, যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭–১৮ সালে ₹৮৮৯.৩৪ কোটি-তে পৌঁছায়। এরপর কোভিড-১৯ মহামারির সময় ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়। ২০২০–২১ সালে ব্যয় কমে ₹২৮১.৭১ কোটি এবং ২০২১–২২ সালে ₹২১৪.৯৪ কোটি-তে নেমে আসে। তবে এই পতন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২৩–২৪ সালে আবার ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ₹৩৫৩.৯৮ কোটি। এই ওঠানামার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট সরকারি বিজ্ঞাপন ব্যয় এখন আর সাময়িক নয়, বরং এটি শাসনব্যবস্থার একটি কৌশলগত ও ধারাবাহিক অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি। ২০২৩–২৪ থেকে ২০২৫–২৬ সময়কালে সরকার গুগল ও ইউটিউবে ₹১২০ কোটির বেশি এবং মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম)-এ ₹২৪.৪৫ কোটি ব্যয় করেছে। এটি প্রমাণ করে যে সরকারি যোগাযোগ এখন ডিজিটাল মাধ্যমে বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রোতাদের লক্ষ্য করে বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়, যা প্রচারের প্রভাব অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়। তবে এখানেই প্রশ্ন, এই প্রযুক্তিগত শক্তি কি শুধুই তথ্য প্রচারের জন্য ব্যবহার হচ্ছে, নাকি এটি জনমত প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করছে?
সরকারি বিজ্ঞাপন যে প্রয়োজনীয় তা অস্বীকার করা যায় না। বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প, স্বাস্থ্য সচেতনতা বা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ সম্পর্কে নাগরিকদের জানানো অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সমালোচকদের মতে, যখন বিজ্ঞাপনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছবি বা প্রচারণামূলক ভাষা প্রাধান্য পায়, তখন তা তথ্যের সীমা ছাড়িয়ে ইমেজ গঠন বা রাজনৈতিক প্রচারে পরিণত হতে পারে।
বিশেষ করে, ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সেই বক্তব্য, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে তিনি প্রচারের বদলে কাজের উপর জোর দেন তার সঙ্গে বর্তমান তথ্যের একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়। এই বৈপরীত্যই মূল প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করে তোলে: এই ব্যয় কি শুধুই জনসেবার জন্য, নাকি এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে?
এই বিপুল ব্যয়ের প্রভাব শুধু রাজনীতিতে নয়, মিডিয়া কাঠামোতেও পড়ছে। অনেক সংবাদমাধ্যমই এখন সরকারি বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভরশীল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিন্ট মিডিয়ার বিজ্ঞাপনের একটি বড় অংশ কয়েকটি বড় সংবাদমাধ্যমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর ফলে একটি অর্থনৈতিক নির্ভরতা তৈরি হয়, যা পরোক্ষভাবে সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি সরাসরি সেন্সরশিপ নয়, বরং স্ব-নিয়ন্ত্রণ (self-censorship) যেখানে সংবাদমাধ্যম নিজেরাই সমালোচনামূলক প্রতিবেদন থেকে বিরত থাকতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়!
সরকারি তথ্য সংসদে প্রকাশিত হওয়ায় স্বচ্ছতার একটি দিক অবশ্যই রয়েছে, তবে শুধু তথ্য প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রকৃত জবাবদিহিতা। এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে: এই ব্যয়ের পরিমাণ কি যুক্তিযুক্ত, এটি কীভাবে বণ্টন করা হচ্ছে, এবং এর মূল উদ্দেশ্য কি সত্যিই জনকল্যাণ, নাকি জনমত গঠন? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ও সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
সরকারি বিজ্ঞাপন ব্যবহার নতুন নয়। আগের সরকার গুলিও এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। তবে বর্তমান সময়ে এর পরিমাণ, ধারাবাহিকতা এবং প্রযুক্তিগত ব্যবহার অনেক বেশি উন্নত। প্রায় ₹৬,০০০ কোটি ব্যয় এবং ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার দেখায় যে সরকারি যোগাযোগ এখন একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
Newslaundry-এর এই প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে, গণতন্ত্রে সরকারি বিজ্ঞাপনের সঠিক সীমা কোথায়? সরকারের উচিত নাগরিকদের তথ্য দেওয়া, কিন্তু সেই তথ্য যেন অতিরিক্ত প্রচারে পরিণত না হয়। একই সঙ্গে, মিডিয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং জনসাধারণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
সবশেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়: কখন তথ্য প্রচার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে পরিণত হয়? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে গণতন্ত্রের ভারসাম্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে!
◉ ORMD09182ZD08136
ডিসক্লেইমার: এই নিবন্ধটি একটি মতামতভিত্তিক লেখা। এখানে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব এবং তা কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিনিধিত্ব করে না। আলোচনায় ব্যবহৃত তথ্য বিভিন্ন প্রকাশ্য উৎস ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। পাঠকদের নিজস্ব বিবেচনা ও যাচাই করে মতামত গঠনের অনুরোধ করা হচ্ছে।

