মতামত: নিরাপত্তার নামে নিয়ন্ত্রণ-আইটি আইনের আড়ালে অনলাইন মতপ্রকাশে নিয়ন্ত্রণ!

GK Dutta
0

মতামত: ০১লা এপ্রিল, ২০২৬: বর্তমান সময়ে ভারতে ইন্টারনেট শুধুমাত্র তথ্যের উৎস নয়, এটি গণতান্ত্রিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারছেন, সরকারকে প্রশ্ন করতে পারছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারছেন। এই ডিজিটাল পরিসর গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে তথ্য প্রযুক্তি আইন, ২০০০ (আইটি অ্যাক্ট) অনুযায়ী সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও বেড়েছে। আজকের মূল প্রশ্ন হলো এই ক্ষমতা কি শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি এটি কখনও কখনও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করছে?

এই বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে। প্রথমত, সরকারের দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধ করা। দ্বিতীয়ত, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই দুই দিকই গুরুত্বপূর্ণ এবং একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলা উচিত।

আইটি অ্যাক্ট এর অধীনে সরকারকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারা ৬৯এ। এই ধারার মাধ্যমে সরকার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, যেমন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে অনলাইন কনটেন্ট ব্লক করতে পারে। এই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল Shreya Singhal v. Union of India মামলায়। সুপ্রিম কোর্ট এই ধারাকে বৈধ বলে ঘোষণা করে, কারণ এতে কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা (safeguards) রয়েছে, যেমন লিখিত কারণ, নির্দিষ্ট ভিত্তি এবং পর্যালোচনার সুযোগ।

সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছিল:
“মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধানের একটি মৌলিক মূল্যবোধ।”
একই সঙ্গে আদালত এটাও বলেছিল যে, এই স্বাধীনতার উপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত হতে হবে এবং অতিরিক্ত হওয়া চলবে না।

তবে বাস্তবে সমস্যা শুরু হয় এই আইনগুলির প্রয়োগের ক্ষেত্রে। ধারা ৬৯এ-এর অধীনে যে ব্লকিং আদেশগুলি জারি করা হয়, সেগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গোপন রাখা হয়। ফলে সাধারণ মানুষ জানতেই পারে না কেন একটি পোস্ট বা অ্যাকাউন্ট সরানো হলো। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও স্পষ্ট কারণ বা আপিল করার সুযোগ পান না। এই স্বচ্ছতার অভাব ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তোলে।

পরবর্তীতে তথ্য প্রযুক্তি (ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস) বিধি, ২০২১ চালু হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে দ্রুত অবৈধ কনটেন্ট সরাতে বলা হয় এবং সরকারি নির্দেশ মানতে বাধ্য করা হয়। যদি তারা তা না করে, তাহলে তারা আইনি সুরক্ষা (সেকশন ৭৯-এর ‘সেফ হারবার’) হারাতে পারে।

এই চাপের কারণে প্ল্যাটফর্মগুলি অনেক সময় দ্রুত কনটেন্ট সরিয়ে দেয়, এমনকি সেটি আইনত বৈধ হলেও। ফলে একধরনের অতিরিক্ত সেন্সরশিপ (over-censorship) দেখা যায়। এতে করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই পরিস্থিতি একটি “চিলিং এফেক্ট” তৈরি করে। অর্থাৎ, মানুষ ভয় পায় তাদের মতামত প্রকাশ করতে। তারা মনে করেন, সমালোচনা করলে পোস্ট মুছে যেতে পারে বা আইনি সমস্যায় পড়তে পারেন। সুপ্রিম কোর্টও এই বিষয়টি স্বীকার করেছে। Shreya Singhal v. Union of India মামলায় আদালত বলেছিল:
“আইনের অপব্যবহারের সম্ভাবনা থাকলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ভীত করে তুলতে পারে।”
তবে শুধুমাত্র সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিলেই সম্পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। আজকের দিনে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভুয়ো খবর, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং উস্কানিমূলক তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় এগুলি সহিংসতা বা অশান্তির কারণ হয়। তাই সরকার যুক্তি দেয় যে, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শক্তিশালী আইনি ক্ষমতা প্রয়োজন।

ভারতের সংবিধানও ১৯(২) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের উপর সীমাবদ্ধতা অনুমোদন করে, যেমন জনশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য। তাই এই ক্ষমতার অস্তিত্ব নিজেই অসাংবিধানিক নয়। মূল প্রশ্ন হলো এর সঠিক এবং সীমিত ব্যবহার।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা বা আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ জানাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের ব্যবস্থা ধারা ৬৯এ-এর নির্ধারিত প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে পারে। এতে আইনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কমে যেতে পারে।

এছাড়া, সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা প্রায়ই দুর্বল। যদি কারও পোস্ট মুছে ফেলা হয়, তাহলে সেটি চ্যালেঞ্জ করা সহজ নয়। প্ল্যাটফর্মের অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সবসময় কার্যকর হয় না এবং আইনি পথে গেলে তা সময়সাপেক্ষ।

সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলির ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তারা এখন শুধু প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হয়ে উঠেছে। কিন্তু তারা আদালত নয়। ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং আইনি ঝুঁকি এড়ানোর জন্য তারা অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, যা সবসময় ন্যায়সঙ্গত নাও হতে পারে।

সম্প্রতি ভারতে আইটি আইনের প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে Section 69A-এর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

১ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত The Indian Express পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানা যায় যে, কেন্দ্র সরকার সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম X (আগের Twitter)-কে একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্লক করার নির্দেশ দেয়।

এই নির্দেশ অনুযায়ী প্রায় ১২টি অ্যাকাউন্ট খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্লক করতে বলা হয়। তবে X-এর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, এই অ্যাকাউন্টগুলোর বেশিরভাগ কনটেন্ট Section 69A-এর নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে না এবং এই ধরনের ব্লকিং “proportionate” বা যুক্তিসঙ্গত নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্ল্যাটফর্মটি দাবি করে যে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের কোনও পূর্ব শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তোলে।

এছাড়া, মার্চ ২০২৬-এ সরকার IT Rules পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে, যেখানে অন্যান্য মন্ত্রকগুলোকেও কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে Reuters জানায় যে, হাজার হাজার অ্যাকাউন্ট, এমনকি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অ্যাকাউন্টও অস্থায়ীভাবে ব্লক করা হয়েছিল, যা পরে জনমতের চাপে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এই ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট যে, আইটি আইনের ক্ষমতা শুধুমাত্র নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং এর প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠছে।

তবুও, এটাও বলা যায় না যে আইটি আইনের ক্ষমতা সম্পূর্ণ নেতিবাচক। এই আইন ডিজিটাল জগতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে। নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ইন্টারনেট অপব্যবহারের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ যেন স্বাধীনতাকে অযথা সীমাবদ্ধ না করে।

সমাধান হিসেবে কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, ব্লকিং আদেশের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা আনা উচিত। দ্বিতীয়ত, প্রভাবিত ব্যক্তিদের জন্য সহজ এবং দ্রুত আপিলের ব্যবস্থা থাকা দরকার। তৃতীয়ত, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ (oversight) ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা যেতে পারে।

শেষ কথা হলো, আইটি অ্যাক্ট ও অনলাইন মতপ্রকাশ নিয়ে এই বিতর্কটি “নিয়ন্ত্রণ বনাম স্বাধীনতা”-র সরল প্রশ্ন নয়। এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয়। আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন তার সঠিক ব্যবহার।

একটি সুস্থ গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা থাকতে হয়। আইন সেই জায়গাকে রক্ষা করবে, এইটাই প্রত্যাশা। নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা, দুটোকেই সম্মান জানিয়ে এগোনোর মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সমাধান।
ORMD09173ZD08020
এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণ সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে, এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত সম্পুর্ন ব্যক্তিগত, এটি পাঠক বা অন্যের মতামত প্রকাশ করে না। ব্যবহৃত তথ্য সরকারি প্রতিবেদন, প্রকাশিত সংবাদ এবং উপলব্ধ জনসাধারণের উৎস থেকে সংগৃহীত। কোনো তথ্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আলোচনার পরিসর তৈরি করা; এটি কোনো সরকারি অবস্থান বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রতিনিধিত্ব করে না।
full-width

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!