বুক রিভিউ: নেহেরু এন্ড বোস: প্যারালাল লাইভস!

GK Dutta
0

নেহেরু এন্ড বোস: প্যারালাল লাইভস বইটি রুদ্রাংশু মুখার্জী এর লেখা একটি ঐতিহাসিক নন-ফিকশন বই। এই বইতে ভারতের দুই মহান নেতা জওহরলাল নেহেরু এবং সুভাষ চন্দ্র বোস-এর জীবন, চিন্তা ও পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তাদের ভূমিকা ও মতাদর্শকে তুলনামূলকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ভারতীয় ইতিহাস সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী পাঠকদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও তথ্যসমৃদ্ধ বই। বিশেষ করে, যখন ইতিহাসকে ঘৃণা ছড়ানো বা ভুল ধারণা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন এই বইটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।

এই বইটিতে দুই নেতার জীবন একসঙ্গে সমান্তরালভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শুরুতে তাদের পথ অনেকটাই একই ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা ভিন্ন পথে এগিয়ে যান। বইটি এটাও দেখায় যে মতভেদ মানেই শত্রুতা নয়।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা:
প্রথম অধ্যায়গুলোতে তাদের পারিবারিক পটভূমি ও শিক্ষাজীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নেহরু ও বোস দুজনেই প্রতিষ্ঠিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করেন। পাশ্চাত্য চিন্তাধারার প্রভাব তাদের উপর পড়লেও, তারা ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।

জাতীয় আন্দোলনে প্রবেশ:
পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে দেখানো হয়েছে কীভাবে তারা স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হন। দুজনেই মহাত্মা গান্ধীর দ্বারা অনুপ্রাণিত হন এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য হন। এই সময়ে তাদের চিন্তাধারা প্রায় একরকম ছিল এবং স্বাধীনতার জন্য তাদের উৎসাহ ছিল প্রবল।

রাজনীতিতে উত্থান:
পরবর্তী অংশে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে তারা কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। নেহরু গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হয়ে অহিংস নীতিকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, বোস গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপের পক্ষে ছিলেন।

মতাদর্শগত পার্থক্য:
এই অংশে দুই নেতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতভেদের কথা তুলে ধরা হয়েছে। নেহরু গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র ও ধীর পরিবর্তনে বিশ্বাস করতেন, আর বোস দ্রুত ও সরাসরি পদক্ষেপের পক্ষে ছিলেন। তাদের মতভেদ ব্যক্তিগত নয়, বরং ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ফল।

কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব:
বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বোসের কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হওয়া এবং পরবর্তী সংঘাত। তার মতামত নিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে, ফলে তিনি পদত্যাগ করেন। এটি তার ও নেহরুর সম্পর্কের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে আসে।

ভিন্ন পথের যাত্রা:
কংগ্রেস ছাড়ার পর বোস সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি গঠন করেন এবং বিদেশি সহায়তায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই চালান। অন্যদিকে, নেহরু কংগ্রেসের মধ্যেই থেকে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে যান।

শেষ অধ্যায়:
শেষ অংশে তাদের জীবনের শেষ সময়ের কথা বলা হয়েছে। বোসের আকস্মিক ও রহস্যময় মৃত্যুর উল্লেখ রয়েছে। মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল। বোসের মৃত্যুর পর নেহরুর দুঃখবোধের কথাও এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

এই বইটি আমার কাছে খুব তথ্যসমৃদ্ধ ও সুন্দরভাবে লেখা মনে হয়েছে। ভাষা সহজ, তাই ইতিহাসের বই হয়েও বুঝতে অসুবিধা হয় না। লেখক দুই নেতার কথাই সমানভাবে তুলে ধরেছেন এবং কোনো পক্ষপাত দেখাননি।
বইটির একটি বড় গুণ হলো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই মহান নেতা সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা দূর করে। অনেকেই মনে করেন নেহরু ও বোস একে অপরের শত্রু ছিলেন, কিন্তু এই বই দেখায় যে তাদের সম্পর্ক ছিল আরও জটিল যেখানে বন্ধুত্বও ছিল, আবার মতভেদও ছিল।
তবে কিছু অংশ একটু বেশি বিশদ হওয়ায় সাধারণ পাঠকদের কাছে ধীরগতির মনে হতে পারে। তবুও, সামগ্রিকভাবে এটি ছাত্রছাত্রী ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য খুবই উপকারী।

এই বইয়ের মূল বার্তা হলো মহান নেতাদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও তারা একই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করতে পারেন। এটি আমাদের শেখায় যে মতপার্থক্য স্বাভাবিক এবং ইতিহাসকে সঠিকভাবে বোঝা খুবই জরুরি।

পরিশেষে, Nehru and Bose: Parallel Lives ভারতীয় ইতিহাসে আগ্রহী সকল পাঠকের জন্য একটি অত্যন্ত ভালো বই। এটি দুই মহান নেতার জীবন ও অবদানকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে। বইটি গবেষণাভিত্তিক এবং সহজ ভাষায় লেখা।

আমি ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং যারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে গভীরভাবে বুঝতে চান, তাদের সকলকে এই বইটি পড়ার জন্য অনুরোধ করছি।

ORMD09167ZD07954

full-width

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!