মতামত: মণিপুরের সহিংসতা-রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না নীরব সম্মতি?

GK Dutta
0

মতামত: ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬: উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য Manipur আবারও রক্তাক্ত। তিন বছর ধরে চলা সহিংসতা যেন এখন এক স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এ বিষ্ণুপুরে এক বোমা ও রকেট হামলায় দুই শিশুর মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? এটি কি শুধুই জাতিগত সংঘাত, নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক নীরবতার ফল?
সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা গেছে, গভীর রাতে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে দুই শিশুর মৃত্যু হয় এবং তাদের মা গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার পরই রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ জনতা নিরাপত্তা শিবিরে হামলা চালায়, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আরও প্রাণহানি ঘটে।
এই ঘটনাগুলি স্পষ্ট করে যে, পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অস্থির এবং সামান্য উত্তেজনাও বড় সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।
প্রশাসনের দাবি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বাস্তব কি তাই বলছে? যদি নিয়ন্ত্রণেই থাকে, তবে কেন বারবার বোমা হামলা হচ্ছে? কেন সাধারণ মানুষ এখনও নিরাপদ নয়? কেন তিন বছরেও স্থায়ী শান্তি ফিরছে না? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অস্পষ্ট।
এই সহিংসতার শিকড় ২০২৩ সালের ৩ মে-তে। মেইতেই সম্প্রদায়ের তফসিলি উপজাতি (ST) মর্যাদার দাবিকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত জাতিগত দাঙ্গায় রূপ নেয়। এরপর থেকে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত উপত্যকায় মেইতেই এবং পাহাড়ে কুকি-জো।
এই বিভাজন শুধু ভৌগোলিক নয়, এটি মানসিক ও সামাজিক। একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস এতটাই বেড়েছে যে সহাবস্থান প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
সংঘাতের মানবিক দিক আরও ভয়াবহ। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২৫০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬০,০০০-এর বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। হাজার হাজার বাড়িঘর পুড়ে গেছে, বহু ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলি শুধু পরিসংখ্যান নয় এগুলি মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের গল্প। ত্রাণ শিবিরে বেড়ে উঠছে এক প্রজন্ম, যারা সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছে। এটি শুধুমাত্র একটি রাজ্যের সংকট নয়, এটি একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, রাষ্ট্র কোথায়?
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, বাহিনী মোতায়েন, এই সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলি কি সমস্যার মূল সমাধান? নাকি শুধুই অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ?
বারবার দেখা গেছে, ইন্টারনেট বন্ধ করে তথ্যপ্রবাহ রোধ করা হচ্ছে। কিন্তু এতে কি সমস্যা কমছে, নাকি স্বচ্ছতা আরও কমছে? তথ্যের অভাবে গুজব ছড়ানো আরও সহজ হয়, যা আবার নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক স্তরে আরও বড় ব্যর্থতা চোখে পড়ে। তিন বছর ধরে চলা এই সংঘাতে জাতীয় স্তরে শক্তিশালী রাজনৈতিক উদ্যোগ বা সর্বদলীয় ঐক্য দেখা যায়নি। মাঝে মাঝে শান্তির আহ্বান জানানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, দায়বদ্ধতার অভাব। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে যে সহিংসতার ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ তদন্ত ও বিচার হয়নি। এর ফলে অপরাধীরা শাস্তি পায় না, এবং সহিংসতা আরও বাড়ে।
এছাড়াও, সাম্প্রতিক ঘটনায় তদন্তভার National Investigation Agency-এর হাতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, তদন্ত দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং তাৎক্ষণিক শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়।
এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে এই সহিংসতা কি শুধুই স্থানীয় সমস্যা, নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন? যখন একটি রাজ্য দীর্ঘদিন ধরে অশান্ত থাকে, তখন তা শুধুমাত্র রাজ্যের সমস্যা থাকে না, তা দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার ওপরও প্রশ্ন তোলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে ইতিহাস, জমি, পরিচয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার জটিল সমীকরণ। কিন্তু এই জটিলতা সত্ত্বেও, সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
আজ মণিপুরে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন, বিশ্বাস পুনর্গঠন
কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই বিশ্বাস তৈরি করবে কে?
যদি সরকার নিরপেক্ষভাবে সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপে না বসে, যদি দ্রুত বিচার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত না হয়, তবে এই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হবে। আর তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ।
মণিপুর আজ আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে রেখেছে, যেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক নীরবতা এবং সামাজিক বিভাজনের এক কঠিন বাস্তবতা।
প্রশ্ন একটাই, আর কতদিন?


◉ ORMD09188ZD08230

ডিসক্লেইমার: এই নিবন্ধটি একটি মতামতভিত্তিক লেখা। এখানে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব এবং তা কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিনিধিত্ব করে না। আলোচনায় ব্যবহৃত তথ্য বিভিন্ন প্রকাশ্য উৎস ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। পাঠকদের নিজস্ব বিবেচনা ও যাচাই করে মতামত গঠনের অনুরোধ করা হচ্ছে।

🔗 রেফারেন্স (সংবাদ সূত্র)

full-width

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!