মতামতঃ ২৬শে জানুয়ারী, ২০২৬: শ্রীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার অন্তর্গত ত্রীসাম বাগান বাড়ি সংক্রান্ত সাম্প্রতিক একটি গুরুতর ও সংবেদনশীল ঘটনা আজ শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয় এটি আমাদের সমাজের বিবেক, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের একটি কঠিন পরীক্ষা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছেন, আবার কেউ নীরব থেকেছেন। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো একটি অংশ নীরব থাকার পাশাপাশি নানান কু-যুক্তি তুলে ধরে ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন।
“সময় নেই”, “নৈতিক প্রশ্ন আছে”, “ইচ্ছে না থাকলে এমন হতো না”, “এতদিন চুপ ছিল কেন” এই প্রশ্নগুলো আজ শ্রীপুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এগুলো কি সত্যিই যুক্তি, নাকি নিজেদের দায়িত্ব এড়ানোর আরামদায়ক অজুহাত?
যারা বলেন, সময়ের অভাবে প্রতিবাদে সামিল হতে পারছেন না তাঁদের কাছে প্রশ্ন, সময়ের অভাব কি সত্যিই ন্যায়বিচারের পথে বাধা হতে পারে? সমাজে অন্যায় হলে প্রতিবাদ করা কি কেবল অবসর বিনোদনের বিষয়? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যখনই মানুষ “সময় নেই” বলে মুখ ফিরিয়েছে, তখনই অন্যায় আরও শক্তিশালী হয়েছে।
আর যারা নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে ভুক্তভোগীকেই সন্দেহ করছেন, দোষারুপ করছেন, তাঁদের নৈতিকতার মানদণ্ড কোথায় দাঁড়িয়ে? যে নৈতিকতা দুর্বলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, কিন্তু ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করে না, তা নৈতিকতা নয়, তা সুবিধাবাদ।
সবচেয়ে ভয়ংকর যুক্তিটি হলো “ভুক্তভোগীর ইচ্ছে না থাকলে এমন কাজ সম্ভব হতো না!” এই বক্তব্য শুধু অজ্ঞতার প্রকাশ নয়, এটি সরাসরি অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার শামিল। এই যুক্তি মানলে সমাজে আর কোনও ধর্ষণ, শোষণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারকে অপরাধ বলা যায় না। কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক কাঠামোতে, অর্থনৈতিক নির্ভরতায় ক্ষমতার সম্পর্ক কখনোই সমান হয় না। অনেক সময় “না” বলার সুযোগই থাকে না। ভয়, হুমকি, সামাজিক কলঙ্ক এসব বাস্তবতাকে অস্বীকার করা মানে বাস্তব জীবন থেকে চোখ বন্ধ করে রাখা অথবা বুঝেও এড়িয়ে যাওয়া।
আর “এতদিন চুপ ছিল কেন” এই প্রশ্নটি করার আগে কি কেউ জানতে চেয়েছে, সে কীসের ভয়ে চুপ ছিল? নিজের নিরাপত্তা, পরিবার, সন্তান, জীবিকার প্রশ্ন, সামাজিক অপমান, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, এই ভয়গুলো কি তুচ্ছ? নীরবতা কখনও সম্মতির প্রমাণ নয়। অনেক সময় নীরবতা বেঁচে থাকার কৌশল। আজ যখন ভুক্তভোগী সাহস করে মুখ খুলছেন, তখন তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানে ভবিষ্যতের সব ভুক্তভোগীদের জন্য একটি ভয়ংকর বার্তা দেওয়া “চুপ থাকাই নিরাপদ!”
দুঃখের বিষয় হলো, যারা প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছেন, তাঁদেরই অনেকে বিদ্রূপ করছেন। বলা হচ্ছে “ঝামেলা বাড়াচ্ছে”, “নাটক করছে”, “অন্য উদ্দেশ্য আছে”। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি ন্যায়বিচারের দাবি তোলা ঝামেলা হয়, তবে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করাকে আমরা কী বলব?
প্রতিবাদ মানে কাউকে আগেই দোষী সাব্যস্ত করা নয়। প্রতিবাদ মানে সুষ্ঠু তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার দাবি। যারা প্রতিবাদ করেন, তাঁরা সমাজের শত্রু নন, তাঁরাই সমাজের বিবেক।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। নীরবতা সবসময়ই অপরাধের পক্ষে যায়। আজ যদি একজন অসহায় নারীর পাশে সমাজ না দাঁড়ায়, কাল সেই সমাজের দরজায় অন্য অন্যায় কড়া নাড়বে।
এই লড়াই কোনও একক পরিবারের নয়, কোনও রাজনৈতিক দলের নয়, এই লড়াই মানবিকতার। ন্যায়বিচার কোনও দয়া নয়, এটি অধিকার। আর অধিকার রক্ষা করতে হলে সমাজকেই এগিয়ে আসতে হয়।
শ্রীপুর আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা চাইলে কু-যুক্তিতে নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে পারি, আবার চাইলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারি, আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ মানে ভাঙচুর নয়, প্রতিবাদ মানে মানবিক অবস্থান।
আজ শ্রীপুরবাসীর ঐক্য শুধু একটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করবে না, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা দেবে, এই সমাজ অন্যায় মেনে নেয় না।![]()
◉ ORMD09108ZD07238
ডিসক্লেইমার: এই লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের ব্যক্তিগত ও নাগরিক অবস্থান থেকে উপস্থাপিত। লেখার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা নয়, বরং সুষ্ঠু তদন্ত, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবেন। ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে সচেতন ও দায়িত্বশীল উপস্থাপনার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

