মতামতঃ ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ঃ ত্রিপুরায় সাম্প্রতিক অপরাধ পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৪,০৩৩টি মামলার তুলনায় ২০২৫ সালে মোট নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা প্রায় ৩,৬৯৮-এ নেমে এসেছে, অর্থাৎ ৮ শতাংশেরও বেশি হ্রাস। খুন, হামলা, দাঙ্গা এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও লক্ষণীয় কমতি দেখা গেছে। রাজ্যে গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অপরাধ হার নথিভুক্ত হয়েছে। মোট নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশাসনিক দক্ষতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ইতিবাচক প্রতিফলন। একটি সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসেবে এই সাফল্যকে সহজভাবে দেখা যায় না; এটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতারও ইঙ্গিত দেয়।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে এই পরিসংখ্যানকে কি আমরা সম্পূর্ণ সাফল্যের চিত্র হিসেবে দেখব, নাকি এটিকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে?
অপরাধের সংখ্যা কমা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কম অপরাধ মানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা। দীর্ঘ সময় ধরে অপরাধের হার কমে আসা সাধারণত উন্নত পুলিশি ব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত এবং প্রশাসনিক নজরদারির ফল। এই দিক থেকে ত্রিপুরা একটি ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে।
কিন্তু অপরাধের পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায় সেটি হলো রিপোর্টিং বা অভিযোগ নথিভুক্তির প্রশ্ন। যে অপরাধের অভিযোগ দায়ের হয় না, তা কোনও পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মতো ত্রিপুরাতেও কখনও কখনও অভিযোগ ওঠে যে সব ক্ষেত্রে সহজে এফআইআর নথিভুক্ত হয় না, অথবা অনেক মানুষ সামাজিক লজ্জা, আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা বা প্রশাসনিক ঝামেলার আশঙ্কায় অভিযোগ দায়ের করতে এগিয়ে আসেন না। এই বাস্তবতা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
অতএব, অপরাধ কমার প্রকৃত মূল্য তখনই স্পষ্ট হবে, যখন সাধারণ মানুষ নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করবেন যে যে কোনও অভিযোগ বাধাহীনভাবে নথিভুক্ত হবে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধের পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা সংখ্যার উপর যতটা নির্ভর করে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে সেই সংখ্যার পেছনের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার উপর।
এছাড়াও আরেকটি উদ্বেগের বিষয় ক্রমশ সামনে আসছে মাদক ও নারকোটিক সংক্রান্ত মামলার বৃদ্ধি। সামগ্রিক অপরাধ কমলেও মাদক পাচার ও বাজেয়াপ্তকরণের ঘটনা বাড়ছে। প্রশাসনের মতে এটি কঠোর নজরদারির ফল, কিন্তু একই সঙ্গে এটিও ইঙ্গিত করতে পারে যে পাচার নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে এবং যুবসমাজের একটি অংশ মাদক সমস্যার ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সীমান্তবর্তী রাজ্য হোয়ার কারণে ত্রিপুরা এই সমস্যার প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে।
মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। নেশা আসক্তি পরিবারকে ধংস করে দেয়, কর্মক্ষমতা কমায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সামগ্রিক অপরাধ কমার পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
ত্রিপুরার বর্তমান পরিস্থিতিকে তাই একদিকে সাফল্য বলা যায়, অন্যদিকে এটিকে সতর্কবার্তাও বলা যায়। অপরাধ কমেছে এটি নিশ্চয়ই ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে রিপোর্টিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, সহজ এফআইআর নথিভুক্তি, গ্রামীণ এলাকায় আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদক সমস্যার বিরুদ্ধে কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
আরও একটি দিক হলো শহর-গ্রামের বৈষম্য। জনঘনত্ব বেশি হওয়ায় আগরতলা-কেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই বেশি মামলা নথিভুক্ত হয়। গ্রামীণ জেলাগুলিতে কম সংখ্যা দেখা গেলেও অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসা বা রিপোর্টিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রভাব থাকতে পারে। সব জেলার মানুষের জন্য সমানভাবে আইনগত সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পর্যবেক্ষণগুলি কোনওভাবেই রাজ্যের অগ্রগতিকে খাটো করে না। অপরাধের ধারাবাহিক হ্রাস কার্যকর প্রশাসনেরই প্রতিফলন। কিন্তু সাফল্য যেন আত্মতুষ্টির কারণ না হয়; বরং আরও গভীর সংস্কারের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ত্রিপুরার সামনে এখন সুযোগ রয়েছে সহজ এফআইআর নথিভুক্তি নিশ্চিত করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, মাদকবিরোধী উদ্যোগ জোরদার করা এবং অপরাধ প্রতিরোধে সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ বাড়ানো। নিয়মিত স্বচ্ছ অপরাধ পর্যালোচনা এবং জনসাধারণের সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নেওয়া বিশ্বাস আরও শক্তিশালী করবে।
২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অপরাধ হার নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক মাইলফলক। তবে জননিরাপত্তা শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; এটি পরিমাপ করা হয় নাগরিকদের আস্থার মাধ্যমে তারা কতটা নিরাপদ বোধ করেন, অভিযোগ জানাতে কতটা স্বাধীনতা পান এবং বিচার ব্যবস্থার উপর কতটা ভরসা করতে পারেন।
পরিসংখ্যান আমাদের একটি দিক দেখায়; বাস্তব নিরাপত্তা নির্ভর করে মানুষের আস্থার উপর। যদি মানুষ মনে করেন যে তারা নিরাপদ, তাদের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা হবে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, তবেই এই সাফল্য প্রকৃত অর্থে অর্থবহ হয়ে উঠবে।
সেই অর্থে ত্রিপুরার এই সাফল্য একদিকে সন্তুষ্টির মুহূর্ত, অন্যদিকে দায়িত্বেরও স্মারক। পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক, কিন্তু প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো স্বচ্ছতা বজায় রাখা, মাদকের মতো নতুন হুমকির মোকাবিলা করা এবং প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বরকে ব্যবস্থার মধ্যে স্থান দেওয়া।
ত্রিপুরা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। অর্জিত সাফল্য ধরে রাখা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা এই দুইয়ের সমন্বয়ই আগামী দিনের প্রকৃত পরীক্ষা।
◉ ORMD09126ZD07488
ডিসক্লেইমারঃ এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত ও বিশ্লেষণ সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে। ব্যবহৃত তথ্য সরকারি প্রতিবেদন, প্রকাশিত পরিসংখ্যান এবং উপলব্ধ জনসাধারণের উৎস থেকে সংগৃহীত। কোনো তথ্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আলোচনার পরিসর তৈরি করা; এটি কোনো সরকারি অবস্থান বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রতিনিধিত্ব করে না।




